বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, আর্থিক প্রস্তুতি এবং কঠোর পরিশ্রম। এই বিষয়গুলো সামনে রেখে শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের HSC 2026 পরীক্ষার্থীদের জন্য ‘HSC 2026 – What’s Next? | Study Abroad’ শীর্ষক বিশেষ অনলাইন কর্মশালা ও প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন করে জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক (Jamia Alumni Network)।
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় Zoom এর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, স্কলারশিপ, ভিসা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা হয়।
কর্মশালায় অতিথি আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন জামেয়ার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমান ইংরেজি শিক্ষক সজিবুল ইসলাম খান (জামেয়ান ২০০৪) এবং Greenway International এর CEO তারেক আহমদ (জামেয়ান ২০০০)।
কর্মশালার উদ্দেশ্য ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের অনারারি প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোহাম্মদ মনজুর হক (জামেয়ান ২০০০)।
IELTS নয়, ইংরেজি ভাষায় প্রকৃত দক্ষতা অর্জন জরুরি
ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে সজিবুল ইসলাম খান বলেন, IELTS মূলত ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন আর বাস্তব জীবনে সাবলীলভাবে ইংরেজি ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়।
ইংরেজিতে দক্ষ হতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত পড়া, শোনা, বলা ও লেখার অনুশীলন। শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভাষাটিকে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষার্থীদের নিজেদের ইংরেজি শব্দভান্ডার (Vocabulary) যাচাই করার জন্য তিনি একটি সহজ ও ব্যবহারিক পদ্ধতি তুলে ধরেন।
যেকোনো IELTS প্রস্তুতির বই থেকে একটি Reading Passage পড়ে দেখো, সেখানে কতগুলো শব্দের অর্থ তোমার অজানা।
- ৪–৫টি শব্দ অজানা হলে: এটি তুলনামূলকভাবে ভালো শব্দভান্ডারের ইঙ্গিত হতে পারে। নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাও।
- ১০টির বেশি শব্দ অজানা হলে: শব্দভান্ডার আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে।
- ২০টি বা তার বেশি শব্দ অজানা হলে: পরিকল্পিত ও নিবিড় অনুশীলনের মাধ্যমে Vocabulary উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক IELTS মূল্যায়ন নয়; বরং নিজের শব্দভান্ডারের অবস্থান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার একটি সহজ আত্মমূল্যায়ন পদ্ধতি। অনুচ্ছেদের দৈর্ঘ্য ও কঠিনতার ওপর ফলাফল নির্ভর করতে পারে।
তাঁর আলোচনার মূল বার্তা ছিল, শুধু IELTS পরীক্ষায় ভালো নম্বর নয়, ইংরেজি ভাষাকে বুঝতে, শিখতে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারাই হওয়া উচিত প্রকৃত লক্ষ্য।
বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, দৈনন্দিন যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং পেশাগত উন্নতির ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষায় কার্যকর দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা: সুযোগ, খরচ ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা
Greenway International এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক আহমদ যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া ও ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে স্নাতক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, আবেদন প্রক্রিয়া, স্কলারশিপ, ভিসা এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নীতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং আর্থিক শর্ত ভিন্ন হতে পারে। এমনকি একই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সের ক্ষেত্রেও ভর্তির শর্ত আলাদা।
তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি।
তিনি বিশেষভাবে টিউশন ফি, আবাসন, খাবার, যাতায়াত, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামগ্রিক আর্থিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা শুধু একটি সুযোগ নয়, বরং নিজের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। তাই আবেগের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত বাজেট, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সুস্পষ্ট শিক্ষাগত লক্ষ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পড়াশোনার পাশাপাশি সম্ভাব্য খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ
জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোহাম্মদ মনজুর হক কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেন:
“আমাদের উদ্দেশ্য তোমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং প্রয়োজনীয় তথ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে তোমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা।”
তিনি শিক্ষার্থীদের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন:
১. নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যের কথার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে সরকারি ও স্বীকৃত উৎস থেকে তথ্য যাচাই করতে হবে।
২. বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট যাচাই: পছন্দের কোর্স, ভর্তির যোগ্যতা, আবেদন পদ্ধতি, সময়সীমা, টিউশন ফি ও স্কলারশিপ সম্পর্কে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
৩. নিজের আগ্রহ ও লক্ষ্য নির্ধারণ: কী পড়তে চাও, কেন পড়তে চাও এবং ভবিষ্যতে কী করতে চাও – এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে হবে। সঠিক বিষয় নির্বাচন ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৪. নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া: অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎসের তথ্য তুলনা এবং নিজের সামর্থ্য, আগ্রহ ও লক্ষ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ সব সময় সহজ নয়। নতুন পরিবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, পড়াশোনার চাপ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং পরিবার থেকে দূরে থাকার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে।
“শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও অধ্যবসায় প্রয়োজন। বিদেশে যাওয়াই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়; বরং নির্ধারিত শিক্ষা সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করাই হওয়া উচিত মূল উদ্দেশ্য।”
বিশ্বজুড়ে জামেয়ানদের সহযোগিতার সেতুবন্ধন
কর্মশালায় জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের অন্যতম উদ্দেশ্য তুলে ধরে মনজুর হক বলেন, বিশ্বের বহু দেশে জামেয়ার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে রয়েছেন। তাঁদের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগকে নতুন প্রজন্মের কল্যাণে কাজে লাগানোই নেটওয়ার্কের অন্যতম লক্ষ্য।
একজন জামেয়ান উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবনের উদ্দেশ্যে নতুন কোনো দেশে গেলে, সম্ভব হলে সেখানকার অভিজ্ঞ জামেয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনা প্রদান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি করতে চায় জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক।
“নতুন দেশে একটি সঠিক পরামর্শ, একটি পরিচিত যোগাযোগ কিংবা সামান্য সহযোগিতাও কারও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কখনো কখনো এই ছোট্ট সহযোগিতাই বড় সাফল্যের পথ তৈরি করে দেয়।”
তিনি বলেন, জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এমন একটি সহযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করবেন না, বরং নতুন প্রজন্মের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পাশে দাঁড়াবেন।
পরিশ্রম, তাওয়াক্কুল ও নতুন প্রজন্মের পাশে থাকার অঙ্গীকার
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মনজুর হক জীবনের লক্ষ্য অর্জনে সঠিক নিয়ত, সততা, অধ্যবসায় এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ওপর ভরসা রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
“আমরা চেষ্টা করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম পরিকল্পনা করো, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করো, অভিজ্ঞদের পরামর্শ নাও এবং লক্ষ্য অর্জনে কঠোর পরিশ্রম করো। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ওপর পূর্ণ ভরসা রাখো।
জীবনের পথে বাধা আসবে, চ্যালেঞ্জ থাকবে, কখনো ব্যর্থতাও আসতে পারে। কিন্তু সততা, ধৈর্য, নিষ্ঠা ও অবিচল প্রচেষ্টা ধরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে জামেয়ান পরিবারসহ অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মানুষের সহযোগিতা চাইতে দ্বিধা করবে না।
আমাদের দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করা; আর সফলতা দান করার মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।”
অভিজ্ঞতা বিনিময়ে আনন্দ, শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞতা
কর্মশালার প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, ইংরেজি ভাষার প্রস্তুতি এবং আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। অতিথি আলোচকরা নিজেদের জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
অংশগ্রহণকারীরা এমন একটি সময়োপযোগী, তথ্যবহুল ও উপকারী কর্মশালা আয়োজনের জন্য জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
অতিথি আলোচক সজিবুল ইসলাম খান ও তারেক আহমদও নতুন প্রজন্মের জামেয়ানদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে আনন্দ ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
তাঁদের অনুভূতিতে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি – নিজেদের শিক্ষাজীবনে হয়তো এ ধরনের সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা পাওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু আজ নিজেদের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জীবনের শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের জামেয়ানদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারা তাঁদের জন্য বিশেষ আনন্দের।
“আমরা হয়তো এমন দিকনির্দেশনা পাইনি, কিন্তু আজ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জামেয়ানদের সেই সহযোগিতা দিতে পারছি – এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।” – অতিথিদের অনুভূতির সারমর্ম।
জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে অতিথি আলোচকদ্বয় এবং অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে জামেয়ার বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে উঠবে এবং শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আজকের অভিজ্ঞতা আগামী দিনের জামেয়ানদের পথচলা সহজ করুক। একজন জামেয়ানের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হয়ে উঠুক আরেকজন জামেয়ানের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
বড় স্বপ্ন, বড় সম্ভাবনা – পাশে আছে জামেয়ান পরিবার!
💙 Once a Jamian, Always a Jamian.




