ইসলাম শিক্ষার ক্লাসে বিজ্ঞান, সমাজ ও বিশ্ব – নাদিরের স্মৃতিতে মরহুম জামাল জনাবের অনন্য পাঠদান

কিছু শিক্ষক পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় পড়িয়ে যান। আবার কিছু শিক্ষক সেই অধ্যায়ের সূত্র ধরে শিক্ষার্থীর সামনে খুলে দেন আরও বড় একটি পৃথিবী।

জামেয়ার ২০০৯ ব্যাচের নাদির আহমেদের স্মৃতিতে মরহুম জামাল উদ্দিন জনাব ছিলেন দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষক।

২০১৮ সালের ৮ মার্চ ফেসবুক এ জামাল জনাবকে নিয়ে নিজের স্মৃতি লিখতে গিয়ে নাদির শুরু করেছিলেন একটি সহজ উপলব্ধি দিয়ে – একজন ভালো শিক্ষক জীবনে যে শিক্ষা দিয়ে যান, তা সারা জীবন মনে থাকে।

তাঁর ভাষায়, “জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে জামাল জনাব আজও মনের মাঝে সজীব হয়ে আছেন।”

স্মৃতিটি লেখা হয়েছিল প্রিয় শিক্ষকের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীর কয়েক দিন আগে। জামাল উদ্দিন জনাব ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ রাত ২টার সময় ইন্তেকাল করেন। জামেয়ার মাঠে বাদ জোহর অনুষ্ঠিত তাঁর জানাজায় প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সহকর্মী, আত্মীয়স্বজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় শিক্ষক মরহুম জামাল উদ্দিন জনাবকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এবং তাঁর পরিবারের সবাইকে ভালো রাখুন। আমিন।

ইসলাম শিক্ষার ক্লাস – কিন্তু আলোচনা শুধু বইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না

নাদির আহমেদের স্মৃতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ জামাল জনাবের পাঠদানের ধরন।

জনাব ক্লাসে প্রবেশ করলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেন অন্যরকম আনন্দ তৈরি হতো। ইসলাম শিক্ষা বইয়ের নির্দিষ্ট একটি বিষয় দিয়ে তিনি আলোচনা শুরু করতেন। এরপর ধীরে ধীরে সেটির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ যত গভীরে যেত, শ্রেণিকক্ষও তত নীরব হয়ে আসত। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনত।

নাদিরের স্মৃতিতে সেই অনুভূতিটি ছিল এতটাই প্রবল যে – “ক্লাস শেষের ঘণ্টা কখন বেজে উঠত তা বুঝাই যেত না।”

বরং ঘণ্টা বাজলে আফসোস হতো – “ক্লাসটা যদি আরো কিছুক্ষণ দীর্ঘায়িত হতো?”

একজন শিক্ষকের পাঠদান সম্পর্কে একজন শিক্ষার্থীর এর চেয়ে সুন্দর মূল্যায়ন সম্ভবত খুব বেশি প্রয়োজন হয় না।

ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীর সংযোগ

জামাল জনাবের ক্লাসের আরেকটি বিশেষত্ব নাদিরের স্মৃতিতে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। ইসলাম শিক্ষা পড়াতে গিয়ে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকতেন না।শিক্ষার্থীরা যাতে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে, সেজন্য আলোচনায় নিয়ে আসতেন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিষয়, বিজ্ঞান এবং সামাজিক ও বাস্তব জীবনের বিভিন্ন উদাহরণ।

অর্থাৎ ধর্মীয় শিক্ষা তাঁর ক্লাসে শুধু মুখস্থ করার একটি বিষয় ছিল না। বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করতেন তিনি।

নাদির বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক চরিত্র গঠনে জামাল জনাবের বিশ্লেষণের গুরুত্ব।

এই স্মৃতির জায়গাটি জামেয়ার শিক্ষাদর্শের ইতিহাসের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী (রহ.) জামেয়ার যে প্রজন্ম তৈরির স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, সেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, সুন্দর চরিত্র এবং দেশ ও সমাজের জন্য দায়িত্বশীল মানুষ গড়ে তোলার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

নাদিরের স্মৃতিতে জামাল জনাবের একটি ইসলাম শিক্ষা ক্লাস যেন সেই দর্শনেরই একটি ছোট্ট বাস্তব চিত্র হয়ে ওঠে।

শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, উচ্চশিক্ষার জন্যও অনুপ্রেরণা

নাদিরের ভাষ্যে জামাল জনাব শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে ভূমিকা রাখতেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন।

এটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষকের প্রভাব অনেক সময় পরীক্ষার ফলাফলে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

একজন শিক্ষক হয়তো কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথমবারের মতো উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তৈরি করেন। কেউ হয়তো তাঁর কাছ থেকেই জানতে শেখে যে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও প্রশ্ন করতে হয়। আবার কারও নৈতিক মূল্যবোধ বা জীবনবোধ গঠনের পেছনে থেকে যান কোনো শিক্ষক।

বহু বছর পর একজন শিক্ষার্থী যখন সেই শিক্ষককে স্মরণ করেন, তখনই হয়তো সেই প্রভাবের প্রকৃত গভীরতা বোঝা যায়।

“সকল শিক্ষার্থীদের সমান ভাবে দেখতেন”

নাদিরের স্মৃতিতে আরও একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে – “স্যার সর্বদা সকল শিক্ষার্থীদের সমান ভাবে দেখতেন।”

একজন শিক্ষকের ক্ষেত্রে এই স্মৃতিটি বিশেষ মূল্যবান।

ক্লাসের ভালো শিক্ষার্থী, দুর্বল শিক্ষার্থী কিংবা ভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থী – সবার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি একজন শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নাদির জামাল জনাবকে স্মরণ করেছেন সময়ানুবর্তী, ধার্মিক ও আদর্শবান মানুষ হিসেবেও।

তাঁর কাছে জামাল জনাব তাই শুধু একজন বিষয় শিক্ষক ছিলেন না। ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক।

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন কি এটাই?

জামাল উদ্দিন জনাব জামেয়ার সঙ্গে চার দশকেরও বেশি সময় যুক্ত থেকে হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন বলে Jamia Alumni Network এর মৃত্যু সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে তাঁর ইন্তেকালের পর জামেয়া মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতিও তাঁর সঙ্গে কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও জামেয়া পরিবারের গভীর সম্পর্কের একটি সাক্ষ্য হয়ে আছে।

কিন্তু একজন শিক্ষকের জীবনের প্রভাব বোঝার আরেকটি উপায় আছে।

তাঁর মৃত্যুর চার বছর পরও যখন একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী লিখছেন – জনাব আজও তাঁর মনের মধ্যে সজীব;

যখন প্রায় এক দশক আগের একটি ক্লাসের অনুভূতিও তাঁর মনে রয়ে গেছে;

যখন তিনি এখনো মনে করতে পারেন – ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজলে তাঁর আফসোস হতো;

তখন বোঝা যায়, শিক্ষকটি শুধু একটি বিষয় পড়িয়ে যাননি।

তিনি শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

আর সম্ভবত একজন শিক্ষকের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার সেখানেই।

স্মৃতি সংরক্ষণই ইতিহাস সংরক্ষণ

জামেয়ার প্রায় অর্ধশতাব্দীর পথচলায় এমন অসংখ্য শিক্ষক এসেছেন, যাঁদের ক্লাস, কথা, শাসন, স্নেহ কিংবা একটি ছোট্ট উপদেশ আজও বিভিন্ন প্রজন্মের জামেয়ানদের মনে বেঁচে আছে।

কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো লিখে না রাখলে এক প্রজন্মের সঙ্গে অনেক ইতিহাসও হারিয়ে যেতে পারে।

২০০৯ ব্যাচের নাদির আহমেদ ২০১৮ সালে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতিটি লিখে রেখেছিলেন বলেই আজ আমরা জামাল জনাবের শ্রেণিকক্ষের ভেতরের একটি ছোট্ট ছবি দেখতে পাচ্ছি –

একজন শিক্ষক ইসলাম শিক্ষার বই খুলছেন।

একটি বিষয় দিয়ে আলোচনা শুরু করছেন।

ধীরে ধীরে সেখানে যুক্ত হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সমাজ, বিজ্ঞান, দেশ ও আন্তর্জাতিক পৃথিবী।

আর সামনে বসে থাকা শিক্ষার্থীরা এতটাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে যে কখন ক্লাস শেষের ঘণ্টা বেজে গেছে, তারা টেরই পায়নি।

এমন স্মৃতিই হয়তো একজন শিক্ষককে তাঁর শ্রেণিকক্ষের সময়সীমার অনেক বাইরে বাঁচিয়ে রাখে।

আল্লাহ তাআলা মরহুম জামাল উদ্দিন জনাবের শিক্ষাদান ও মানুষ গড়ার প্রচেষ্টাকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

সূত্র: ২০০৯ ব্যাচের নাদির আহমেদের ৮ মার্চ ২০১৮ তারিখের Facebook স্মৃতিচারণ এবং Jamia Alumni Network এ সংরক্ষিত জামাল উদ্দিন জনাবের ইন্তেকাল ও জানাজার সংবাদ।

Discover more from Jamia Alumni Network

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading