শিক্ষকতার দীর্ঘ জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন, তাদের বেড়ে ওঠা দেখেছেন, সাফল্যে আনন্দিত হয়েছেন। কিন্তু কিছু ঘটনা সময়ের ব্যবধান পেরিয়েও একজন শিক্ষকের স্মৃতিতে অমলিন থেকে যায়। শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক ভূগোল শিক্ষক জনাব এনামুল হক-এর কাছে তেমনই এক গর্বের স্মৃতি ১৯৯১ সালের – তাঁর ছাত্র ইমাদুর রহমান (এসএসসি ১৯৯২) কে ঘিরে।
সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপে এক আলাপচারিতায়, এনামুল হক জনাব তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের নানা স্মৃতি আমি ২০০০ ব্যাচের মনজুর এর সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন। আলাপের একপর্যায়ে আমাকে তাঁর চিরচেনা সম্বোধনে ‘মনজুরুল হক’ বলে ডেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের এই বিশেষ ঘটনাটি অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন। সময়ের এত ব্যবধানের পরও ছাত্রের সেই অসাধারণ অর্জনের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে একজন শিক্ষকের গর্ব যেন আজও একইভাবে জীবন্ত।
হাতে ইত্তেফাক ও একটি রচনা
১৯৯১ সাল। ইমাদুর রহমান তখন শাহজালাল জামেয়ার দশম শ্রেণির ছাত্র। একদিন সে একটি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা এবং নিজের লেখা একটি রচনা নিয়ে এনামুল হক জনাবের কাছে হাজির হন। এনাম জনাব তখন জামেয়া হোস্টেল এ থাকতেন।
পত্রিকায় জাতীয় মৎস্য অধিদপ্তর-এর উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য মৎস্যবিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতার একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। ইমাদ সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চেয়েছিলেন। নিজের লেখা রচনাটি শিক্ষককে দেখিয়ে তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা চান।
এনামুল হক জনাব মনোযোগ দিয়ে পুরো রচনাটি পড়েন। দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর লেখার মান দেখে তিনি বেশ মুগ্ধ হন। তাঁর মনে হয়েছিল, রচনাটির মধ্যে সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে তিনি রচনাটিকে আরও তথ্যবহুল ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য একটি বিশেষ পরামর্শ দেন – বাংলাদেশের একটি মানচিত্র যুক্ত করে সেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য ও মৎস্যসম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করতে।
শিক্ষকের সেই পরামর্শ গ্রহণ করে ইমাদ তাঁর রচনাটি চূড়ান্ত করেন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতায় জমা দেন।
এক মাস পর আবার হাতে দৈনিক ইত্তেফাক
এরপর কেটে যায় প্রায় এক মাস।
একদিন ইমাদ আবারও এনামুল হক জনাবের কাছে এলেন। এবারও তাঁর হাতে দৈনিক ইত্তেফাক। তবে এবার তিনি কোনো রচনা সংশোধন করাতে আসেননি – এসেছেন একটি অসাধারণ সুখবর নিয়ে।
প্রতিযোগিতার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আর সেখানে সারা বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন শাহজালাল জামেয়ার দশম শ্রেণির ছাত্র ইমাদুর রহমান।
এনামুল হক জনাবের বিস্ময় ও আনন্দ আরও বেড়ে যায় যখন তিনি অন্য বিজয়ীদের পরিচয় দেখেন। তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী এবং কক্সবাজার মহিলা কলেজের একজন শিক্ষার্থী।
অর্থাৎ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জামেয়ার দশম শ্রেণির একজন ছাত্র জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন।
একজন শিক্ষকের গর্ব, ৩৫ বছর পরও
প্রায় ৩৫ বছর পর সেই দিনের কথা বলতে গিয়েও এনামুল হক জনাবের কণ্ঠে ছিল একই গর্ব ও আনন্দ।
একজন স্কুলপড়ুয়া জামেয়ান দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের পেছনে ফেলে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হয়েছিল – একজন শিক্ষক হিসেবে এই অর্জন তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বিশেষ করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগে সেই শিক্ষার্থী তাঁর কাছেই এসেছিল নিজের লেখা নিয়ে, চেয়েছিল পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা।
এই ছোট্ট ঘটনাটিই যেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর উদ্যোগ, একজন শিক্ষকের আন্তরিক দিকনির্দেশনা এবং সেই শিক্ষার্থীর জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন – সব মিলিয়ে এটি জামেয়ার ইতিহাসের এক অনন্য স্মৃতি।
সেদিনের সেই দশম শ্রেণির ছাত্র, আজকের ড. ইমাদুর রহমান
এনামুল হক জনাবের সেই স্মৃতি আজ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি, ১৯৯১ সালের সেই মেধাবী ও অনুসন্ধিৎসু দশম শ্রেণির ছাত্রটি পরবর্তী জীবনে কোথায় পৌঁছেছেন।
ইমাদুর রহমান (এসএসসি ১৯৯২) জামেয়া থেকে কুমিল্লা বোর্ডের ১৩তম স্থান নিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে নটর ডেম কলেজ, ঢাকা থেকে ১৯৯৪ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার পথে তিনি মালয়েশিয়া থেকে টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে BAEng, ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি থেকে রেডিও কমিউনিকেশনে এমএসসি এবং ডেনমার্কের Aalborg University থেকে Wireless Communication এ PhD অর্জন করেন।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ও গবেষণার জগতে তিনি দীর্ঘ কর্মজীবন গড়ে তোলেন। সুইডেনে Ericsson এ প্রায় ১৭ বছর গবেষণায় যুক্ত থেকে Principal Researcher হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজের পরিধিও অত্যন্ত বিস্তৃত – তাঁর নামে ৩০০ এর বেশি granted patent রয়েছে এবং আরও শত শত উদ্ভাবন পেটেন্ট প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
পরবর্তীতে ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে তিনি Bangladesh Satellite Company Limited (BSCL) এর Managing Director ও Chief Executive Officer (CEO) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এনামুল হক জনাবের ১৯৯১ সালের সেই স্মৃতির দিকে ফিরে তাকালে তাই একটি সুন্দর যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ইমাদের মধ্যে ছিল নিজে থেকে একটি জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ, নিজের লেখা আরও ভালো করার জন্য শিক্ষকের কাছে গিয়ে পরামর্শ নেওয়ার মানসিকতা এবং সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা।
সেদিন দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে ফেলে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হওয়া হয়তো ছিল তাঁর মেধা ও সম্ভাবনার এক প্রাথমিক স্বাক্ষর। পরবর্তী জীবনে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পেশাগত সাফল্য যেন সেই সম্ভাবনারই বিস্তৃত পরিণতি।
প্রায় ৩৫ বছর আগে যে ছাত্রের একটি রচনা পড়ে এনামুল হক জনাব মুগ্ধ হয়েছিলেন, আজ সেই ছাত্রের দীর্ঘ অর্জনের দিকে তাকালে একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর গর্বিত হওয়ার কারণটি যেন আরও পূর্ণতা পায়।
জামেয়ায় এনামুল হক জনাবের দীর্ঘ পথচলা
জনাব এনামুল হক ১৯৮৪ সালের ১৭ মার্চ শাহজালাল জামেয়ায় ভূগোল শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ভূগোল, প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যায় বিএসসি সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি জামেয়ার অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেছেন। পাঠদানের নিজস্ব ধরন, শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা এবং সহজ-সাবলীল ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম জামেয়ানের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন।
দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাঁর অবসর উপলক্ষে বিদায়ী আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক কর্মজীবনের সমাপ্তি হলেও তাঁর সঙ্গে জামেয়া ও জামেয়ানদের সম্পর্ক শেষ হয়নি। তাঁর শিক্ষার্থীরা আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও তাঁদের স্মৃতিতে ‘এনাম জনাব’ আজও অত্যন্ত আপন একটি নাম।
আর এনামুল হক জনাবের নিজের স্মৃতিতেও রয়ে গেছে তাঁর শিক্ষার্থীদের এমন অসংখ্য গল্প।
ইমাদুর রহমানের এই গল্পটি তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ – যেখানে দশম শ্রেণির একজন জামেয়ানের জাতীয় পর্যায়ের অর্জন প্রায় সাড়ে তিন দশক পরও তাঁর শিক্ষকের হৃদয়ে একই রকম গর্বের সঙ্গে জীবন্ত।










