‘বিসমিল্লাহ’ বলে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’! ‘নেবু’ – একটি মাত্র শব্দ নিয়ে পুরো ক্লাস! শেষ ৫ মিনিটের নিরবতার পরিবর্তে হৈ চৈ! ১৯৯৬ ব্যাচের ডাঃ সোহেলের স্মৃতিতে জামেয়ার জনাবেরা ও ক্লাসের যত গল্প

স্কুলজীবনের কত পাঠই না সময়ের সঙ্গে ভুলে যায়। কোন অধ্যায়ে কী ছিল, পরীক্ষায় কোন প্রশ্ন এসেছিল – সব মনে থাকে না। কিন্তু কোনো শিক্ষকের একটি কথা, ক্লাসের কোনো দুষ্টুমি কিংবা হঠাৎ ঘটে যাওয়া হাসির একটি ঘটনা থেকে যায় আজীবন।

জামেয়া ১৯৯৬ ব্যাচের ডাঃ ফজলুল হক সোহেলের স্মৃতিতেও তেমনই জীবন্ত হয়ে আছেন তাঁর কয়েকজন জনাব।

কোথাও আছে দুষ্টু ছাত্রের কাণ্ডে পুরো ক্লাসজুড়ে হাসি, কোথাও শাসনের পর শিক্ষকের মমতা, কোথাও একটি মাত্র ‘নেবু’ শব্দ থেকে জ্ঞানের বিশাল জগতে প্রবেশ; আবার কোথাও ছেলে-মেয়ের দড়ি লাফ নিয়ে রীতিমতো সম্মানের লড়াই!

২০০৩ সালে জামেয়ার ২৫ বছর পূর্তি স্মারকে লেখা তাঁর স্মৃতিগুলো যেন নব্বইয়ের দশকের কয়েকটি ক্লাসরুমের দরজা আবার খুলে দেয়।

‘গজল’ শুরু হলো বিসমিল্লাহ দিয়ে, তারপর…

অসম্ভব প্রিয় মাসুক জনাবের ক্লাসের একটি ঘটনা সোহেলের বিশেষভাবে মনে ছিল।

তাঁদের ক্লাসে শওকত নামে এক দুষ্টু ছেলে ছিল। ক্লাসে নানা কাণ্ড করে সে প্রায়ই সবাইকে মাতিয়ে রাখত। একদিন মাসুক জনাব শওকতকে ডাকলেন একটি গজল গাওয়ার জন্য।

শওকতও প্রস্তুত! তবে জনাবের খুব কাছে নয় – একটু নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে শুরু করল অত্যন্ত গম্ভীরভাবে – “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম…”

কিছুক্ষণ বিরতি।

জনাবসহ সবাই হয়তো অপেক্ষা করছেন, এবার নিশ্চয়ই কোনো গজল বা নাশিদ শুরু হবে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই শওকত শুরু করে দিল – “বেদের মেয়ে জোসনা…” 😂

তৎকালীন সময়ে সিনেমার সুবাদে গানটি ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। আজকের ভাষায় বললে হয়তো বলা যেত – ভাইরাল। আর গজল বা নাশিদের সঙ্গে একটি জনপ্রিয় সিনেমার গানের দূরত্ব যে কতটা, সেটিই শওকতের কাণ্ডটিকে আরও হাস্যকর করে তুলেছিল।

একদিকে ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে গম্ভীর সূচনা, অন্যদিকে পরক্ষণেই সিনেমার গান! পুরো ক্লাস হেসে উঠল।

মাসুক জনাব যখন শওকতকে ধরতে এগোলেন, সে আর দাঁড়িয়ে থাকে কেন! দৌড়ে পালাল।

সোহেলের স্মৃতিতে মাসুক জনাবের ক্লাসে এমন হাসি-আনন্দের ঘটনা প্রায়ই ঘটত।

দড়ি লাফ নিয়ে মেয়েদের নালিশ

মাসুক জনাবকে ঘিরে আরেকটি স্মৃতি ছিল ছেলে-মেয়েদের খুনসুটি নিয়ে।

সেই সময়ে জামেয়ায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে পড়ত। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটদের মধ্যে ঝগড়া, দুষ্টুমি, প্রতিযোগিতা আর নালিশও লেগেই থাকত।

একদিন মেয়েরা মাসুক জনাবের কাছে অভিযোগ করল – ছেলেরা নাকি তাদের দড়ি লাফ খেলতে দেয় না!

মাসুক জনাব অভিযোগ শুনলেন।তারপর রাগারাগি না করে মুচকি হাসলেন এবং ছেলেদের দুষ্টুমি বন্ধ করার জন্য ঘোষণা দিলেন এক অভিনব প্রতিযোগিতা – ছেলে বনাম মেয়ে – দেখা যাক কে সবচেয়ে বেশি দড়ি লাফ দিতে পারে!

ঘোষণা শুনে এবার ছেলেদেরই মাথায় হাত! 😂 কারণ দড়ি লাফে মেয়েদের সঙ্গে পেরে ওঠা যে সহজ হবে না, সেটা তারা ভালো করেই জানত।

আর হারলে? সেটাই তো সবচেয়ে বড় ভয়! মেয়েদের কাছে দড়ি লাফে হেরে গেলে মান-সম্মান আর থাকবে কোথায়! 😄

সোহেল লিখেছেন, দড়ি লাফে মেয়েদের সঙ্গে তাঁদের পেরে ওঠার কথাই ছিল না। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছেলে-মেয়েদের খুনসুটিও যেন আরও জমে উঠেছিল।

একটি ছোট অভিযোগের কী চমৎকার সমাধান – বকাঝকা নয়, অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত দুই পক্ষকেই নামিয়ে দেওয়া হলো খেলার মাঠে!

শামসুল ইসলাম জনাব – শাসনের পর যে কথায় রাগ ভুলে যেত

সোহেলের স্মৃতিতে শামসুল ইসলাম জনাব ছিলেন জামেয়ার অত্যন্ত প্রবীণ একজন শিক্ষক।তাঁর ক্লাসের নিজস্ব একটি দৃশ্য ছিল।

ক্লাসে এসেই পকেট থেকে পান-সুপারি বের করে মুখে দিয়ে সবাইকে নিয়ে শুরু করতেন – “রাব্বি যিদনী…”

জনাবের রাগও ছিল। কেউ দুষ্টুমি করলে কখনো কঠোরভাবে শাসন করতেন। ছোট শিক্ষার্থীর কাছে সেই মুহূর্তের শাসন নিশ্চয়ই খুব বড় ব্যাপার মনে হতো।

কিন্তু সোহেলের মনে সবচেয়ে বেশি থেকে গেছে শাসনের পরের ঘটনাটি।

রাগ কমে গেলে ক্লাস থেকে বের হওয়ার আগে সেই ছাত্রকে কাছে ডেকে নিতেন। তারপর স্নেহের সঙ্গে বুঝিয়ে বলতেন – “আমি তো তোমাকে ইচ্ছা করে মারিনি, এরকম আর দুষ্টুমি করো না।”

শিশুমনে একটু আগে পাওয়া শাসনের কষ্ট তখন কোথায় যেন মিলিয়ে যেত।

সোহেলের স্মৃতিতে তাই শামসুল ইসলাম জনাব শুধু রাগী শিক্ষক হয়ে থাকেননি। শাসনের আড়ালে শিক্ষার্থীর প্রতি যে আন্তরিকতা ও মমতা ছিল, সেটিই বহু বছর পর তাঁর লেখায় ফিরে এসেছে।

পাঁচ মিনিট চুপ থাকার নিয়ম – তারপর আরও বেশি শব্দ!

ছাদ জনাব তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত তাঁদের ইংরেজি পড়াতেন। তাঁর ক্লাসের সবচেয়ে মজার নিয়মটি ছিল ক্লাস শেষ হওয়ার আগের পাঁচ মিনিট।

সবাইকে ডেস্কের ওপর মাথা রেখে চুপচাপ থাকতে হবে।

শুনতে খুব সহজ। কিন্তু ছোটদের একটি পুরো ক্লাসকে পাঁচ মিনিট একেবারে নিশ্চুপ রাখা? সেটাই ছিল আসল পরীক্ষা! একজন না একজন শব্দ করবেই।

ছাদ জনাব তখন কে শব্দ করেছে, সেটি শনাক্ত করার নতুন পদ্ধতি চালু করলেন। অন্যরা বিচার করে দোষীকে ধরবে।

ফল হলো উল্টো। একজনের শব্দ থামাতে গিয়ে কে করেছে, কে করেনি – এ নিয়ে বাকিরাও কথা বলতে শুরু করল। সোহেলের স্মৃতিতে, ব্যাপারটা আরও বেড়ে গেল!

নীরবতার জন্য রাখা শেষ পাঁচ মিনিটই যেন হয়ে উঠল ক্লাসের সবচেয়ে সরব সময়। 😄

একটি ‘নেবু’ নিয়েই পুরো ক্লাস!

সব স্মৃতি অবশ্য দুষ্টুমি আর হাসির নয়।

আজিজুল হক মানিক জনাব তাঁদের বাংলা পড়াতেন। সোহেলের ভাষায়, জনাব ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল সমুদ্র।

কোনো লেখককে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কিংবা একটি গল্প পড়ানো মানে শুধু বইয়ের নির্দিষ্ট কয়েকটি লাইন শেষ করা নয়। একটি বিষয় থেকে তিনি চলে যেতেন তার ইতিহাস, সাহিত্য কিংবা বৃহত্তর পৃথিবীর নানা প্রসঙ্গে। কোনো কোনো লেখা পড়াতেই চলে যেত দুই-তিন দিন।

দশম শ্রেণির একটি ঘটনা সোহেলের বিশেষভাবে মনে ছিল।

একটি গল্পে ছিল একটি সাধারণ শব্দ – ‘নেবু’।

সেই একটি ‘নেবু’ নিয়েই আজিজুল হক মানিক জনাব পুরো একটি ক্লাস নিয়ে নিলেন!

কিন্তু আলোচনা শুধু নেবুতেই আটকে থাকেনি। সেখান থেকে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন বিশ্বের পরিস্থিতি, সাহিত্য এবং বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার ইতিহাসের দিকে।পাঠ্যবইয়ের একটি শব্দ যেন হয়ে উঠেছিল আরও বড় জগৎ জানার দরজা।

সোহেল পরে উপলব্ধি করেছেন, জনাবের ক্লাস থেকে এভাবে পাওয়া জ্ঞান তাঁদের পরবর্তী জীবনেও কাজে লেগেছে।

পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে মানুষগুলো থেকে যান

সোহেলের স্মৃতিগুলোর সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই।

তিনি জনাবদের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচিতি লেখেননি। কে কত বছর শিক্ষকতা করেছেন, কে কোন পদে ছিলেন – সেসবও তাঁর স্মৃতির মূল বিষয় নয়। বরং তিনি মনে রেখেছেন মানুষগুলোকে।

মাসুক জনাবের মুচকি হাসি আর ছেলে-মেয়েদের দড়ি লাফ প্রতিযোগিতা।

গজল গাইতে গিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ধরার পর শওকতের দৌড়।

শামসুল ইসলাম জনাবের শাসন, তারপর কাছে ডেকে নরম সুরে বোঝানো।

ছাদ জনাবের পাঁচ মিনিটের নীরবতা, যা শেষ পর্যন্ত আরও বেশি শব্দে পরিণত হতো।

আর আজিজুল হক মানিক জনাবের একটি ‘নেবু’ থেকে পুরো পৃথিবী ও সাহিত্যের নানা ইতিহাসে চলে যাওয়া।

এই ছোট ছোট ঘটনাই হয়তো স্কুলজীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি।

কারণ পাঠ্যবই একদিন বন্ধ হয়ে যায়, পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়, শিক্ষার্থীরা যার যার জীবনে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু বহু বছর পরও কোনো একটি শব্দ, কোনো জনাবের কথা কিংবা ক্লাসের কোনো দুষ্টুমি হঠাৎ মনে পড়ে যায়।

আর মুহূর্তেই মানুষ ফিরে যায় সেই পুরোনো ক্লাসরুমে।

সোহেলের স্মৃতিতে জামেয়ার জনাবেরা তাই শুধু শিক্ষক নন – তাঁরা তাঁর স্কুলজীবনের গল্পের একেকটি জীবন্ত চরিত্র।

ডা. ফজলুল হক সোহেল: চিকিৎসা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের এক অনন্য সমন্বয়
ডা. ফজলুল হক সোহেল বর্তমানে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত। তিনি ডায়াবেটিস, পেইন ম্যানেজমেন্ট, প্যারালাইসিস, নিউরোলজিক্যাল ও মাংসপেশীর সমস্যার পুনর্বাসন চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ।

এছাড়া তিনি পাইওনিয়ার হাসপাতাল, সিলেট এর মেডিকেল ডিরেক্টর। তাঁর পেশাদারিত্ব, যত্নশীল সেবা ও নৈতিক চিকিৎসা চর্চা তাঁকে সিলেট অঞ্চলে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

চিকিৎসা সংগঠনে নেতৃত্ব
ডা. সোহেল বর্তমানে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএইচসিডিএ) এর সিলেট জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি, এবং ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) এর সিলেট জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়ন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে অবদান
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে প্রতিষ্ঠিত সন্থানী জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ইউনিটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
এই উদ্যোগটি চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের মানবিকতা, রক্তদান ও সামাজিক দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করেছে, যা আজও বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়।

মানবিক চিকিৎসক ও প্রেরণাদায়ী জামেয়ান
বড়লেখার পাকশাইল গ্রামের সন্তান ডা. সোহেল নিজেকে সর্বদা মানবতার সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন। তাঁর চিকিৎসা কার্যক্রম, সমাজসেবা ও শিক্ষামূলক উদ্যোগগুলো তাঁকে শুধু একজন চিকিৎসক নয়, একজন মানবিক নেতার মর্যাদা দিয়েছে।

স্মৃতির উৎস
এই লেখার স্মৃতিগুলো ফজলুল হক সোহেল, ১৯৯৬ ব্যাচ-এর স্মৃতিচারণ থেকে নেওয়া। তাঁর লেখাটি প্রকাশিত হয় শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল এন্ড কলেজের ২৫ বছর পূর্তি ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পুনর্মিলনী স্মারক ‘সত্যের সূর্যোদয়’-এ। পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয় ৩ ও ৪ অক্টোবর ২০০৩।

মূল স্মৃতির ঘটনা, রসবোধ ও জনাবদের প্রতি লেখকের অনুভূতি অক্ষুণ্ণ রেখে বিষয়ভিত্তিকভাবে সম্পাদনা ও উপস্থাপন করা হয়েছে।

Discover more from Jamia Alumni Network

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading