‘জামেয়ায় এত পাইলট স্কুলের ছাত্র কেন?’ – সাবিরের স্মৃতিতে স্কুল ড্রেসে বদলে যাওয়া জামেয়ার গল্প

অনেক বছর পর নিজের স্কুলে ফিরে এসে চারদিকে তাকিয়ে হঠাৎ যদি মনে হয় – আমি কি ভুল করে অন্য স্কুলে চলে এলাম?

জামেয়া ১৯৯৩ ব্যাচের শেখ হাফিজ সৈয়দ মকসুদে এলাহী (সাবির) (Syed Maksud Elahi Sabir, 1993 Batch) এর ক্ষেত্রে অনেকটা এমনই হয়েছিল।

জামেয়া ছেড়ে যাওয়ার কয়েক বছর পর আবার ক্যাম্পাসে এসে তিনি দেখলেন চারদিকে ছেলেরা এমন এক ধরনের ইউনিফর্ম পরে আছে, যা তাঁর পরিচিত জামেয়ার পোশাকের সঙ্গে মিলছে না। বরং দেখে তাঁর মনে হলো – জামেয়ায় পাইলট স্কুলের এত ছেলে এলো কোথা থেকে!

একটু পরেই ভুল ভাঙল। এরা পাইলট স্কুলের ছাত্র নয়। এরা জামেয়ারই ছাত্র – বদলে গেছে জামেয়ার স্কুল ড্রেস।

ঢোলা পাজামা-শার্ট থেকে শুরু

২০০৩ সালে জামেয়ার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত ‘সত্যের সূর্যোদয়’ স্মারকে নিজের স্কুলজীবনের স্মৃতি লিখতে গিয়ে সাবির মজা করে বলেছিলেন, জামেয়ার পড়াকালীন সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে যেন “গবেষণা” হয়েছে, সেটি হলো স্কুল ড্রেস।

তাঁর স্মৃতিতে প্রথম দিকের পোশাক ছিল অনেকটা স্লিপিং ড্রেসের মতো ঢোলা পাজামা ও ঢোলা ফুলশার্ট।

জামেয়ার একেবারে শুরুর দিকের, আনুমানিক ১৯৭৮-৮০ সময়কালের ছবিতেও ভিন্ন ধরনের পোশাকের সেই পুরোনো অধ্যায়ের ছাপ দেখা যায়। পরবর্তী আশির দশকের ছবিতে আবার সারিবদ্ধ শিক্ষার্থীদের পোশাকে একটি স্বতন্ত্র জামেয়া পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পাজামা গেল, এলো নেভি ব্লু প্যান্ট

কিন্তু ইউনিফর্ম এক জায়গায় থেমে থাকেনি। সাবিরের ভাষ্যে, কিছুদিন পর পাজামা আউট, নেভি ব্লু প্যান্ট ইন।

এরপরও পরিবর্তন চলেছে। শার্টের নকশায় পরিবর্তন এসেছে – সাদা দুটি ফিতার পরিবর্তে বোতাম। পরে আবার পরিবর্তন হয়ে এসেছে গোটা স্লিপিং ড্রেসের শার্ট।

তারপর?

আকাশি রঙের ফুলশার্ট। সাবির নিজেই লিখেছেন – “তাও আবার হাফকালার।”

একজন শিক্ষার্থীর চোখে এসব ছিল হয়তো বারবার স্কুল ড্রেস বদলে যাওয়ার গল্প। কিন্তু আজ কয়েক দশক পর তাঁর লেখার সঙ্গে পুরোনো ছবিগুলো পাশাপাশি রাখলে এগুলো জামেয়ার পোশাক-ইতিহাসের মূল্যবান সূত্র হয়ে ওঠে।

তারপর সেই ‘পাইলট স্কুল’ মুহূর্ত!

স্কুলজীবন শেষ হলো। সময় পেরিয়ে গেল। বছর কয়েক পর সাবির আবার জামেয়ায় এলেন। কিন্তু এবার চারদিকে তাকিয়ে পরিচিত ইউনিফর্ম আর খুঁজে পাচ্ছেন না। তাঁর স্মৃতিতে তখন জামেয়ার ছাত্রদের দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিল – “জামেয়ায় আবার পাইলট স্কুলের এত ছেলে এলো কোথেকে!”

কিছুক্ষণ পরই বুঝলেন, এটি অন্য কোনো স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভিড় নয়। বিবর্তনের ধারায় এবার জামেয়ার ছাত্রদের গায়ে সাদা শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট।

যে পোশাক তাঁর চোখে প্রথম মুহূর্তে পাইলট স্কুলের ইউনিফর্ম বলে ধরা দিয়েছিল, সেটিই তখন নতুন প্রজন্মের জামেয়া ইউনিফর্ম।

একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর কয়েক সেকেন্ডের সেই বিভ্রান্তির মধ্যেই যেন ধরা পড়ে সময়ের পরিবর্তন।তিনি যে জামেয়াকে রেখে গিয়েছিলেন, জামেয়া ততদিনে আর ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই।

ছবিতে ছবিতে পাঁচ দশকের পরিবর্তন

আজ পুরোনো ছবিগুলো একসঙ্গে রাখলে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকের ১৯৭৮-৮০ সময়কাল, আশির দশক, নব্বইয়ের দশক, ২০০০ এর দশক হয়ে বর্তমান ২০২০ এর দশক – প্রতিটি সময়ের ছবিতেই জামেয়ার শিক্ষার্থীদের পোশাকে পরিবর্তনের চিহ্ন রয়েছে।

কখনো পাজামা ও লম্বা-ঢোলা শার্ট, কখনো আকাশি পোশাক, কখনো সাদা শার্টের সঙ্গে নেভি ব্লু প্যান্ট – সময়, প্রয়োজন ও প্রতিষ্ঠানের বিকাশের সঙ্গে জামেয়ার ইউনিফর্মও পেয়েছে নতুন রূপ।

এই ছবিগুলো তাই শুধু স্কুল ড্রেসের ছবি নয়। এগুলো একেকটি সময়ের জামেয়া।

একটি পুরোনো গ্রুপ ছবির ইউনিফর্ম দেখেই কোনো জামেয়ান হয়তো বলে দিতে পারেন – “এটা তো আমাদের সময়ের ড্রেস!”

আরেক প্রজন্মের কাছে পরিচিত জামেয়া আবার সম্পূর্ণ অন্য পোশাকে।

পোশাক বদলেছে, পরিচয়টি রয়ে গেছে

স্কুলে পড়ার সময় প্রতিদিন একই পোশাক পরা হয়তো খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু স্কুল ছেড়ে যাওয়ার পর সেই ইউনিফর্মই হয়ে ওঠে পরিচয়ের অংশ।

সাবিরের গল্পটির সৌন্দর্য এখানেই।

তিনি স্কুল ড্রেসের কোনো আনুষ্ঠানিক ইতিহাস লিখতে বসেননি। নিজের কৈশোরের মজার স্মৃতি লিখেছিলেন। অথচ তাঁর কয়েকটি বাক্য আজ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে – কীভাবে একটি প্রজন্ম জামেয়ার ইউনিফর্ম দেখেছে, কীভাবে সেটি বদলেছে এবং সেই পরিবর্তন একজন পুরোনো শিক্ষার্থীর চোখে কতটা বিস্ময় তৈরি করেছিল।

প্রায় পাঁচ দশকের ছবিগুলো সেই স্মৃতিকে আরও পূর্ণতা দেয়।

ঢোলা পাজামা-শার্ট থেকে নেভি ব্লু প্যান্ট, আকাশি ফুলশার্ট থেকে সাদা শার্ট – ইউনিফর্মের রং ও নকশা বদলেছে বহুবার।

কিন্তু যে পোশাকই হোক, প্রতিটি ছবির সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের একটি পরিচয় কখনো বদলায়নি – তারা জামেয়ান।



স্মৃতি ও ছবির উৎস

এই লেখার মূল স্মৃতিচারণ শেখ হাফিজ সৈয়দ মকসুদে এলাহী (সাবির), ১৯৯৩ ব্যাচ রচিত ‘স্মৃতির কথকতা’ থেকে নেওয়া। লেখাটি প্রকাশিত হয় শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল এন্ড কলেজের ২৫ বছর পূর্তি ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পুনর্মিলনী স্মারক ‘সত্যের সূর্যোদয়’-এ; পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয় ৩ ও ৪ অক্টোবর ২০০৩।

সঙ্গে ব্যবহৃত বিভিন্ন সময়ের জামেয়ার শিক্ষার্থীদের ছবিগুলো প্রতিষ্ঠার শুরুর সময় থেকে ২০২০ এর দশক পর্যন্ত স্কুল ইউনিফর্মের পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। ছবির সময়কাল যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে নথিবদ্ধ নয়, সেখানে আনুমানিক সময়কাল হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল স্মৃতির ঘটনা ও রসবোধ অক্ষুণ্ণ রেখে বর্তমান পাঠকের জন্য লেখাটি বিষয়ভিত্তিকভাবে সম্পাদনা ও পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

আজকের সাবির

আজ তিনি যুক্তরাজ্যে একজন ইসলামিক স্কলার, ইমাম, হাফিজ, শিক্ষাবিদ ও কুরআন শিক্ষক। শেখ হাফিজ সৈয়দ মকসুদে এলাহী সাবির, জামেয়া ১৯৯৩ ব্যাচ, বর্তমানে Lewisham Islamic Institute এর Head of Qur’anic Studies এবং Lewisham Islamic Centre এর Imam হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কুরআনের কিরাআতের বিভিন্ন ধারায় ইজাযাহ অর্জনের পাশাপাশি তিনি দশ কিরাআত (Ashara Qira’at) সম্পন্ন করেছেন। একই সঙ্গে London South Bank University থেকে MSc in Corporate Governance সম্পন্ন করেছেন।

Discover more from Jamia Alumni Network

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading