আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন সবার প্রিয় আজিজুল হক মানিক জনাব

‎إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।”
(সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৬)

গভীর শোক ও দুঃখের সঙ্গে আমরা জানাচ্ছি যে শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জনাব আজিজুল হক মানিক (রহিমাহুল্লাহ) আমাদের মাঝে আর নেই।
তিনি ২০২৩ সালের ২৭ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট শহিদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।

জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছে।

আমরা মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে দোয়া করছি –

‎اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لَهُ ، وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمَهْدِيِّينَ ، وَاخْلُفْهُ فِي عَقِبِهِ فِي الْغَابِرِيْنَ ، وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ ، وَافْسَحْ لَهُ فِي قَبْرِهِ ، وَنَوِّرْ لَهُ فِيهِ

“হে আল্লাহ, তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন, তাঁকে হেদায়াতপ্রাপ্তদের মধ্যে স্থান দিন, তাঁর পরিবারকে উত্তম প্রতিদান দিন, তাঁর কবর প্রশস্ত করুন ও আলোয় পূর্ণ করুন।”

শিক্ষক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক আজিজুল হক মানিক জনাব: আমাদের প্রিয় জামেয়ার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সমাজসেবক আজিজুল হক মানিক জনাব ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মানুষ। লেখক, বক্তা, সংগঠক ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর অবদান সিলেট তথা বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও শিক্ষাঙ্গনে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।

জামেয়ায় শিক্ষকতার দিনগুলো

আজিজুল হক মানিক জনাব শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে দীর্ঘদিন বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ক্লাস ছিল অনন্য, প্রাণবন্ত এবং জ্ঞানে সমৃদ্ধ।
তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, ইতিহাস ও রাজনীতি – সবকিছুকে একসূত্রে বেঁধে পাঠদান করতেন। তাঁর উপস্থাপনা ছিল এত আকর্ষণীয় যে ছাত্ররা তন্ময় হয়ে শুনত, আর অনেক সময় পাশের ক্লাসের ছাত্ররাও সুযোগ পেলে তাঁর ক্লাসে যোগ দিত।

তিনি শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণাদাতা। তিনি ছাত্রদের আত্মবিশ্বাসী হতে, চিন্তা করতে ও নৈতিকতাকে জীবনের কেন্দ্রে রাখতে উৎসাহ দিতেন। তাঁর পাঠদান অনেক জামেয়ান শিক্ষার্থীর জীবনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

আজিজুল হক মানিকের জন্ম ১৮ মার্চ ১৯৬০, সিলেট নগরীর দরগাহ মহল্লার ঝরনার পারে।
তিনি ছিলেন ভাষাসৈনিক, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মুহম্মদ নূরুল হক-এর পুত্র এবং সমাজসেবী ও লেখিকা বেগম নূরুন্নেসা হক-এর সন্তান। তাঁদের আদি নিবাস বিশ্বনাথ উপজেলার দশঘর গ্রামে।

এই সাহিত্যসমৃদ্ধ পরিবারেই বড় হন আজিজুল হক মানিক। তাঁর ভাইবোনদের মধ্যেও সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার ধারাটি প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল।

শিক্ষাজীবন ও ছাত্রনেতৃত্ব

তিনি আম্বরখানা দরগাহ গেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা, দি এইডেড হাই স্কুল থেকে এসএসসি, মদনমোহন কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাহিত্য, বক্তৃতা ও বিতর্কে ছিলেন উজ্জ্বল। মদনমোহন কলেজের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহে পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় কলেজের প্রতিনিধি ও দলনেতা হিসেবে অংশগ্রহণ করে তিনি সিলেটের গৌরব বাড়িয়েছিলেন।

১৯৮২ সালে তিনি প্রার্থী হিসেবে কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন – একজন দক্ষ, যুক্তিবাদী ও আদর্শনিষ্ঠ ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।

লেখালেখি ও সাংবাদিকতা

জনাব আজিজুল হক মানিকের সাহিত্যচর্চা শুরু ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে। তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় মাওলানা ভাসানীর হক কথা পত্রিকায়। পরবর্তীতে তিনি কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, গল্প ও ভ্রমণকাহিনি রচনা করেন, যা স্থান পেয়েছে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায়।
২০১৪ সালে তাঁর লেখা ছড়ার বই নানা রঙের ছড়া প্রকাশিত হয় চৈতন্য প্রকাশনী থেকে।

সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ছিলেন নিরলস কর্মী। ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক সিলহট কণ্ঠ পত্রিকার প্রতিবেদক হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিনি পরবর্তীতে সাপ্তাহিক সুরমা-এর নির্বাহী সম্পাদক ও দৈনিক জালালাবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রায় ২৫ বছর তিনি জালালাবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পত্রিকাটিকে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী করে তুলতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজসেবা

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং এর মুখপত্র আল ইসলাহ সম্পাদনা করেন।
তাঁর নেতৃত্বে সাহিত্য সংসদের পাঠাগার আধুনিকায়ন হয়, এবং ডিউই ডেসিমেল পদ্ধতিতে বই শ্রেণিবিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তিনিই ছিলেন সংলাপ সাহিত্য সংস্কৃতি ফ্রন্টের সক্রিয় সংগঠক, তরুণ সংগঠন ইয়ুথ এপ্রোচ ও শিশু-কিশোর সংগঠন গোলাপ কুঁড়ি (বর্তমানে ফুলকুঁড়ি)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

জনপ্রতিনিধি ও সমাজনেতা

একজন জনপ্রিয় সমাজসেবক হিসেবে তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে ১নং ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন এবং সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন।
তিনি পায়রা সমাজকল্যাণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন।

ব্যক্তিজীবন ও উত্তরসূরি প্রজন্ম

তাঁর সহধর্মিণী দিলওয়ারা বেগম দিলু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী ও ওসমানী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
তাঁদের চার সন্তান –

  • নাজমুস সামাহ, ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষারত,
  • নাসিফ আলভী হক, বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত,
  • নাজিফা তাসফিয়াতআফিক ফারাবি হক, স্কলার্স হোমে অধ্যয়নরত।

শেষ প্রহর ও বিদায়

২০১০ সালে প্রথম স্ট্রোকের পর থেকে তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। ২০২৩ সালের ২৭ জুলাই রাতে শাহিদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
পরদিন বাদ জুমা দরগাহ মসজিদে জানাজা শেষে পিতা মুহম্মদ নূরুল হকের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

একজন সত্যিকারের জামেয়ান জনাব

আজিজুল হক মানিক জনাব ছিলেন একজন বিনয়ী, অধ্যয়নপ্রিয় ও নৈতিক মূল্যবোধে দৃঢ় মানুষ।
তিনি আমাদের প্রিয় জামেয়ার ঐতিহ্য ও শিক্ষার মর্মবাণীকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেছেন।

“তিনি ছিলেন এমন এক শিক্ষক, যিনি শিক্ষাকে শুধু পাঠ নয় – অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছিলেন।”

জামেয়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক তাঁর পরিবার, সহকর্মী, প্রাক্তন ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালা তাঁকে মাফ করুন, তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। আমিন।

আজিজুল হক মানিক
প্রখ্যাত লেখক, ছড়া, কবিতা, সংবাদপত্র

জন্ম : ১৮ মার্চ ১৯৬০ সাল
পিতা : মুহাম্মদ নুরুল হক, অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
মাতা : লেখিকা নুরুন নেছা হক
স্ত্রী : দিলুয়ারা বেগম দিলু-শিক্ষিকা, মেডিকেল উচ্চ বিদ্যালয়
প্রাক্তন ছাত্র : দরগাহ গেইট আম্বরখানা প্রাথমিক বিদ্যালয়, এইডেড হাইস্কুল, মদন মোহন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক : মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদ
প্রাক্তন শিক্ষক : শাহজালাল জামেয়া স্কুল এন্ড কলেজ
প্রাক্তন কাউন্সিলর : ১ নং ওয়ার্ড সিলেট সিটি কর্পোরেশন
অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা : পায়রা সমাজ কল্যাণ সমিতি
প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
সম্পাদক : দৈনিক জালালাবাদ, সিলেট।

📖 তথ্যসূত্র:
এই লেখার বেশিরভাগ তথ্য ও বিবরণ সংগ্রহ করা হয়েছে সাংবাদিক ও গল্পকার সেলিম আউয়াল রচিত নিবন্ধ “আজিজুল হক মানিক, অনন্য প্রতিভার একজন মানুষ” থেকে, যা প্রকাশিত হয়েছিল Shomoy24.co.uk অনলাইন পত্রিকায়।

Azizul Haque Manik Jonab, Former Teacher, Shahjalal Jamia Islamia School and College

Discover more from Jamia Alumni Network

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading